আমাদের সম্পর্কে

সিলেট একটি প্রাচীন জনপদ। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দের ভ্রমণ বিবরণী থেকে এ জেলা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। দশম শতাব্দীতে মহারাজা শ্রীচন্দ্র কর্তৃক উৎকীর্ণ পশ্চিমভাগ তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি এ জেলা জয় করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের ধারণা সিলেট বা শ্রীহট্ট বহু আগে থেকেই একটি উলেস্নখযোগ্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৪ শতকে ইয়েমেনের হযরত শাহজালাল (র.) সিলেট জয় করেন এবং ইসলাম প্রচার শুরম্ন করেন। তাছাড়া মুঘলদের সাথে যুদ্ধ, নানকার বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে এ জেলার অবদান অপরিসীম। বিখ্যাত মুসলিম পরিব্রাজক আল-বিরম্ননী তাঁর ‘কিতাবুল হিন্দ’ নামক গ্রন্থে সিলেটকে সিলাহট নামে উলেস্ন­খ করেন। বহু প্রাচীনকাল থেকেই এ জেলা শ্রীহট্ট নামে পরিচিত ছিল, হিন্দু পৌরাণিক অনুসারে ‘শ্রী’ অর্থ ‘প্রাচুয’র্ বা ‘সৌন্দর্য’ এবং হসত্ম অর্থ ‘হাত’। যেখানে শ্রী এর হসত্ম পাওয়া গিয়েছিল তাই শ্রীহস্থ, যা কালের বিবর্তনে শ্রীহট্ট নাম ধারণ করেছে। আরো একটি শ্রম্নতি, পাথরকে শীলা বলা হয় এবং পাথরের প্রাচুর্য্যের কারণে এ এলাকাকে সিলেট বলা হয়। সিলেট শব্দের অনুসর্গ সিল মানে শীল এবং উপসর্গ হেট মানে হাট অর্থাৎ বাজার। প্রাচীনকাল হতে এ জেলা পাথর (শীল) ও হাটের (ব্যবসা ও বানিজ্যের) প্রাধান্য ছিল বলে ‘শীল’ ও ‘হাট’ শব্দদ্বয় মিলে সিলেট শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। সিলেট জেলা ১৭৭২ সালের ১৭ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত এ জেলা ঢাকা বিভাগের অমত্মর্ভূক্ত ছিল। ঐ বছরই সিলেটকে নবসৃষ্ট আসাম প্রদেশের অমত্মর্ভূক্ত করা হয়। দেশ ভাগের সময় ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে সিলেট জেলা তৎকালীন পূর্ব পাকিসত্মানের অমত্মর্গত হয়। সিলেট জেলা তখন চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন ছিল। ১৯৮৩-৮৪ সালে বৃহত্তর সিলেট জেলাকে ৪টি নতুন জেলায় বিভক্ত করা হয় এবং ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট সিলেট বিভাগের সৃষ্টি হয়। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই সিলেট দ্রম্নত বিকাশ লাভ করতে থাকে। ১৮৯৭ সালের ১২ জুনের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে পুরো শহর ধ্বংস হয়ে গেলেও পরবর্তীতে রেলওয়ে সংযোগসহ রাসত্মাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়। চা বাগানের বিসত্মৃতি এবং ১৯৫০-৬০ দশক থেকে সিলেটের প্রবাসীদের অবদানে এ জেলার উন্নয়ন দ্রম্নত ঘটতে থাকে যা এখনো অব্যাহত আছে।

আয়তন ৩,৪৯০.৪০ বর্গ কি.মি.। উত্তরে ভারতের খাসিয়া-জৈমিত্ময়া পাহাড়, দক্ষিণে মৌলভীবাজার জেলা, পূর্বে ভারতের কাছাড় ও করিমগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা। বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৩.২০ সে., সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩.৬০ সে., বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাত ৩৩৩৪ মি.মি.। সিলেটের প্রধান ও দীর্ঘতম নদী সুরমা (৩৫০ কি.মি.), অপর বৃহৎ নদী হলো কুশিয়ারা। এ জেলায় ছোট বড় মিলিয়ে মোট ৮২টি হাওর-বিল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সিংগুয়া বিল (১২.৬৫ বর্গ কি.মি.), চাতলা বিল (১১.৮৬ বর্গ কি.মি.) উলেস্নখযোগ্য। সিলেটে সর্বমোট রিজার্ভ ফরেষ্ট ২৩৬.৪২ বর্গকি.মি.। জেলার উত্তর-পূর্ব কোণে ভারতের খাসিয়া ও জৈমিত্ময়া পাহাড়ের অংশ বিশেষ বিদ্যমান। সিলেটে বেশ কিছু ছোট ছোট পাহাড় ও টিলা রয়েছে, যার মধ্যে জৈমত্মাপুর টিলা (৫৪ মিটার), শারি টিলা (৯২ মি.), লালাখাল টিলা (১৩৫ মি.), ঢাকা দক্ষিণের টিলা শ্রেণি (৭৭.৭ মি.) উলেস্নখযোগ্য। সিলেট (জেলা শহর) ২৭টি ওয়ার্ড ও ২১০টি মহলস্না নিয়ে গঠিত। ঔপনিবেশিক আমলেই সিলেট দ্রম্নত বিকাশ লাভ করেছে। সিলেট পৌরসভার সৃষ্টি ১৮৭৮ সালে। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন এক মারাত্মক ভূমিকম্প গোটা শহরটিকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলে। পরবর্তীতে ধ্বংসস্ত্তপের ওপর গড়ে উঠে ইউরোপীয় ধাঁচের আরও সুন্দর ও আধুনিক শহর। ১৮৯০ এর দশকের শেষ ভাগে বেশ কিছু রাসত্মাঘাট তৈরি করা হয়। ১৯১২-১৫ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একটি শাখা সিলেটের সাথে সংযুক্ত হলে দেশের অন্যান্য অংশের সাথে সিলেটের বিচ্ছিন্নতার প্রকৃত অবসান ঘটে। চা শিল্পের কারণে বিশ শতকের প্রথম দিকে সিলেট শহরের গুরম্নত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৫০ ও ১৯৬০ দশকে প্রবাসী সিলেটিদের এবং সিলেট শহর দ্রম্নত নগরায়ণ ঘটতে থাকে এবং বর্তমানে ও তা অব্যাহত রয়েছে।